পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নিয়ম ও প্রয়োজনীয় সূরা – ফজর থেকে এশা পর্যন্ত সম্পূর্ণ গাইড
পোস্ট সূচীপত্রঃ
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নিয়ম ও সূরা- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নিয়ম ও সূরা
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কী ও কেন গুরুত্বপূর্ণ
- নামাজ পড়ার সাধারণ নিয়ম (সব ওয়াক্তের জন্য প্রযোজ্য)
- ওযুর নিয়ম ও ওযু ভঙ্গের কারণ (নামাজের আগে যা জানা জরুরি)
- ফজর নামাজের নিয়ম ও সূরা
- যোহর নামাজের নিয়ম ও সূরা
- আসর নামাজের নিয়ম ও সূরা
- মাগরিব নামাজের নিয়ম ও সূরা
- এশা নামাজের নিয়ম ও সূরা
- নামাজে কোন সূরা পড়া বাধ্যতামূলক
- নামাজে সূরা ভুল পড়লে নামাজ হবে কি?
- নতুনদের জন্য সহজ সূরা তালিকা
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন
- উপসংহারঃ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নিয়ম ও সূরা
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার নিয়ম ও প্রয়োজনীয় সূরা
নামাজ ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের অন্যতম। একজন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শুধু ইবাদত নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, শৃঙ্খলা ও আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যম। অনেকেই নামাজ পড়েন, কিন্তু সঠিক নিয়ম ও কোন নামাজে কোন সূরা পড়তে হয়—এ বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে জানা থাকে না। এই পোস্টে ফজর থেকে এশা পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার নিয়ম ও প্রয়োজনীয় সূরা সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো।
| নামাজ | রাকাত | প্রয়োজনীয় সূরা ও নিয়ম |
|---|---|---|
| ফজর | ৪ রাকাত (২ সুন্নত + ২ ফরজ) | ফরজে দীর্ঘ সূরা পড়া সুন্নত। উচ্চস্বরে কেরাত পড়তে হয়। সূরা কাফিরুন ও ইখলাস বেশি পড়া হয়। |
| যোহর | ১০ রাকাত (৪ সুন্নত + ৪ ফরজ + ২ সুন্নত ) | সবগুলো রাকাতে সূরা মনে মনে পড়তে হয়। সূরা আসর, ফিল বা কুরাইশ পড়া যায়। |
| আসর | ৮ রাকাত (৪ সুন্নত + ৪ ফরজ) | কেরাত মনে মনে পড়তে হয়। সূরা তাকাসুর, কাওসার বা মাউন পড়ার চল বেশি। |
| মাগরিব | ৫ রাকাত (৩ ফরজ + ২ সুন্নত) | ফরজের প্রথম দুই রাকাতে উচ্চস্বরে কেরাত। মাঝারি সূরা যেমন সূরা ক্বদর বা জিলযাল পড়া উত্তম। |
| এশা | ৯ রাকাত (৪ ফরজ + ২ সুন্নত + ৩ বিতর) | ফরজের প্রথম দুই রাকাতে উচ্চস্বরে কেরাত। বিতর নামাজে দোয়া কুনুত পাঠ করা ওয়াজিব। |
🔹 নোট:
টেবিলে যে সূরাগুলো দেওয়া হয়েছে সেগুলো বাধ্যতামূলক না; আপনি চাইলে সূরা ফাতিহার পরে যেকোনো সূরা মিলাতে পারেন। আর কিছু নামাজে অতিরিক্ত নফল পড়া যায়, তবে সেগুলো বাধ্যতামূলক নয় এবং নতুনদের জন্য টেবিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যোহর, মাগরিব ও এশা—এই তিন ওয়াক্ত নামাজের পরে ২ রাকাত নফল পড়া যেতে পারে এবং এশার ফরজের আগে ৪ রাকাত সুন্নত (গায়রে মুয়াক্কাদা) পড়ার নিয়ম রয়েছে।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কী ও কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিদিন নির্ধারিত পাঁচ সময়ে আল্লাহ তায়ালার সামনে দাঁড়িয়ে ইবাদত করাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। কুরআন ও হাদিসে নামাজের গুরুত্ব বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। নামাজ মানুষকে অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে এবং একজন মুসলমানের ঈমানকে শক্ত করে।
নামাজ পড়ার সাধারণ নিয়ম (সব ওয়াক্তের জন্য প্রযোজ্য)
শরীর, কাপড় ও নামাজের স্থান পাক হওয়া
সঠিকভাবে ওযু করা
কিবলামুখী হওয়া
নামাজের সময় হওয়া
মনে মনে নিয়ত করা
তাকবিরে তাহরিমা দিয়ে নামাজ শুরু করা
এই শর্তগুলো ছাড়া কোনো নামাজ সহিহ হয় না।
আরো পড়ুনঃ শবে বরাত কবে 2026 তারিখ
ওযুর নিয়ম ও ওযু ভঙ্গের কারণ (নামাজের আগে যা জানা জরুরি)
নামাজ সহিহ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো সঠিকভাবে ওযু করা। ওযু শুধু বাহ্যিক পবিত্রতা নয়, বরং ইবাদতের জন্য মানসিক ও আত্মিক প্রস্তুতির অংশ। ওযু ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ আদায় করলে নামাজ সহিহ হয় না। নিচে ওযুর ফরজ, সুন্নত পদ্ধতি এবং কোন কোন কারণে ওযু ভেঙে যায় তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
ওযুর ফরজ কয়টি ও কী কী
ওযুর ফরজ মোট চারটি। এই চারটি ঠিকভাবে আদায় না হলে ওযু সম্পূর্ণ হয় না।
-
সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ধোয়া (কপালের চুলের গোড়া থেকে থুতনি পর্যন্ত এবং এক কান থেকে অন্য কান পর্যন্ত)
উভয় হাত কনুইসহ ধোয়া
মাথার চার ভাগের এক ভাগ মাসেহ করা
উভয় পা টাখনুসহ ধোয়া
ওযুর সুন্নত পদ্ধতি (ধাপে ধাপে)
যদিও ফরজগুলো আদায় করলেই ওযু হয়ে যায়, তবে সুন্নত অনুযায়ী ওযু করলে সওয়াব বেশি হয়।
নিয়ত করা
বিসমিল্লাহ বলে ওযু শুরু করা
প্রথমে উভয় হাত কবজি পর্যন্ত তিনবার ধোয়া
মিসওয়াক করা (সম্ভব হলে)
তিনবার কুলি করা
তিনবার নাকে পানি দেওয়া ও পরিষ্কার করা
মুখ তিনবার ধোয়া
ডান হাত, তারপর বাম হাত কনুইসহ তিনবার ধোয়া
সম্পূর্ণ মাথা মাসেহ করা
কান ও ঘাড় মাসেহ করা
ডান পা, তারপর বাম পা টাখনুসহ তিনবার ধোয়া
কোন কোন কারণে ওযু ভেঙে যায়
নিচের যে কোনো একটি কারণ ঘটলে ওযু ভেঙে যায় এবং নতুন করে ওযু করা ফরজ হয়—
পেশাব, পায়খানা বা বায়ু নির্গমন হওয়া
শরীর থেকে রক্ত, পুঁজ বা তরল বের হয়ে প্রবাহিত হওয়া
মুখ ভরে বমি হওয়া
ঘুমিয়ে পড়া (যাতে দেহের নিয়ন্ত্রণ না থাকে)
অজ্ঞান হওয়া বা মাতাল হওয়া
নামাজের মধ্যে জোরে হাসা (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)
কোন কোন কারণে ওযু ভাঙে না
অনেকেই এ বিষয়ে বিভ্রান্ত হন। নিচের কাজগুলোতে ওযু ভাঙে না—
রক্ত দেখা গেলেও যদি তা প্রবাহিত না হয়
সামান্য ঘুম, যেখানে বসা অবস্থায় দেহের নিয়ন্ত্রণ থাকে
স্ত্রী বা স্বামীর শরীর স্পর্শ করা (যদি কিছু নির্গমন না হয়)
বমি কম পরিমাণে হওয়া
ওযু সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
ওযু করার সময় তাড়াহুড়া না করে প্রতিটি অঙ্গ ভালোভাবে ধোয়া জরুরি। বিশেষ করে পায়ের টাখনু ও আঙুলের ফাঁক ভালোভাবে ধোয়া না হলে ওযু অসম্পূর্ণ থেকে যায়, যা নামাজ কবুল না হওয়ার কারণ হতে পারে।
📜 ফিকহ নোট:
উপরের বিধানগুলো হানাফি মাযহাব অনুযায়ী উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যান্য মাযহাবে (যেমন শাফেয়ি) কিছু ক্ষেত্রে বিধানে পার্থক্য থাকতে পারে।
আরো পড়ুনঃ ২০২৬ সালের রোজা কত তারিখ থেকে শুরু?
ফজর নামাজের নিয়ম ও সূরা
ফজর নামাজের রাকাত
সুন্নত: ২ রাকাত
ফরজ: ২ রাকাত
ফজর নামাজে পড়ার সূরা
প্রতিটি রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়া ফরজ। এরপর যেকোনো সূরা বা কুরআনের অংশ পড়া যায়।
ফজরে সাধারণত পড়া হয়—
সূরা কাফিরুন
সূরা ইখলাস
সূরা ফালাক
সূরা নাস
ফজরের নামাজে তুলনামূলক একটু দীর্ঘ সূরা পড়া সুন্নত।
যোহর নামাজের নিয়ম ও সূরা
যোহর নামাজের রাকাত
সুন্নত (আগে): ৪ রাকাত
ফরজ: ৪ রাকাত
সুন্নত (পরে): ২ রাকাত
যোহর নামাজে সূরা
যোহরের ফরজ নামাজে সূরা ফাতিহার পর যেকোনো সূরা পড়া যায়। সাধারণত ছোট সূরা পড়া হয়।
উদাহরণ:
সূরা আল-আসর
সূরা আল-ফিল
সূরা কুরাইশ
আসর নামাজের নিয়ম ও সূরা
আসর নামাজের রাকাত
সুন্নত (গায়রে মুয়াক্কাদা): ৪ রাকাত
ফরজ: ৪ রাকাত
আসর নামাজে সূরা
আসর নামাজে সাধারণত ছোট সূরা পড়া হয়।
উদাহরণ:
সূরা তাকাসুর
সূরা কাওসার
সূরা মাউন
মাগরিব নামাজের নিয়ম ও সূরা
মাগরিব নামাজের রাকাত
ফরজ: ৩ রাকাত
সুন্নত: ২ রাকাত
মাগরিব নামাজে সূরা
মাগরিবের ফরজ নামাজে মাঝারি আকারের সূরা পড়া উত্তম।
উদাহরণ:
সূরা ক্বদর
সূরা বায়্যিনাহ
সূরা জিলযাল
এশা নামাজের নিয়ম ও সূরা
এশা নামাজের রাকাত
সুন্নত (আগে): ৪ রাকাত
ফরজ: ৪ রাকাত
সুন্নত (পরে): ২ রাকাত
বিতর: ৩ রাকাত (ওয়াজিব)
এশা ও বিতর নামাজে সূরা
এশা নামাজে ছোট সূরা পড়াই প্রচলিত। বিতর নামাজে তৃতীয় রাকাতে দোয়া কুনুত পড়া ওয়াজিব।
সাধারণ সূরা:
সূরা ইখলাস
সূরা ফালাক
সূরা নাস
নামাজে কোন সূরা পড়া বাধ্যতামূলক
প্রতিটি রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়া ফরজ। সূরা ফাতিহার সঙ্গে অন্য একটি সূরা বা কুরআনের অংশ পড়া ওয়াজিব (ফরজের প্রথম দুই রাকাতে এবং সব সুন্নত ও নফল নামাজে)।
নামাজে সূরা ভুল পড়লে নামাজ হবে কি?
যদি উচ্চারণে সামান্য ভুল হয় কিন্তু অর্থ পরিবর্তন না হয়, তাহলে নামাজ হয়ে যায়। তবে এমন ভুল যাতে অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে নামাজ ভেঙে যেতে পারে। তাই সূরা শুদ্ধভাবে শেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুনদের জন্য সহজ সূরা তালিকা
যারা নতুন নামাজ শিখছেন, তাদের জন্য সহজ ও ছোট সূরাগুলো হলো—
সূরা ইখলাস
সূরা ফালাক
সূরা নাস
সূরা কাওসার
সূরা আসর
এই সূরাগুলো শিখলেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা সম্ভব।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন
সূরা না জানলে নামাজ হবে?
সূরা ফাতিহা জানা জরুরি। অন্য
সূরা না জানলে ছোট আয়াত শিখে পড়া উচিত। তাই বলে সব সময় এটা করা ভালো না আসতে
আসতে সূরা মুখস্ত করা দরকার।
একই সূরা বারবার পড়া যাবে?
হ্যাঁ, নামাজে একই সূরা বারবার
পড়া জায়েজ কিন্তু অন্যান্য সূরা মিলানো ভালো।
সব নামাজে কি জোরে কিরাত পড়তে হয়?
না। ফজর, মাগরিব ও
এশার প্রথম ২ রাকাতে জোরে এবং যোহর ও আসরে নীরবে কিরাত পড়তে হয়।
উপসংহারঃ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নিয়ম ও সূরা
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একজন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য ইবাদত। সঠিক নিয়ম ও প্রয়োজনীয় সূরা জেনে নামাজ আদায় করলে ইবাদতের মান ও খুশু দুটোই বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সূরা ও দোয়া মুখস্থ করুন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথে এগিয়ে যান। যারা নতুন, তারা এই তালিকা ধরে সূরা মুখস্থ শুরু করুন; যারা নিয়মিত নামাজ পড়েন, তারা নিজের আমলের শুদ্ধতা মিলিয়ে নিন, আর পরিবারে বা প্রিয়জনের মধ্যে কেউ শিখতে চাইলে এই গাইডটি শেয়ার করুন—ইনশাআল্লাহ সবার উপকার হবে।


সার্ভিস আইটির নিয়ম মেনে কমেন্ট করুন প্রত্যেকটা কমেন্টের রিভিউ করা হয়।
comment url